মিরপুরে ৫০ বছরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সরকারের কাছে জবাব চান এলাকাবাসী
সরকারি টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লুটের অভিযোগ, অনিশ্চয়তায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা; পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন….
রাজধানীর মিরপুরে প্রায় পাঁচ দশক ধরে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা একটি প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার নামের এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, একদল ব্যক্তি কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সরকারি ইপিআই টিকা, টিকাদানের রেজিস্টার, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়।
ঘটনার পর থেকে এলাকার মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান কার্যক্রম এবং জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রঃ
দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর এলাকার অসচ্ছল পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি।
এখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হতো বলে জানা গেছে।
বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই, এমন অনেক পরিবারের কাছে এই কেন্দ্রটি ছিল স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সরকারি টিকা ও রেজিস্টার লুটের অভিযোগঃ
ঘটনার পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সরকারি টিকা ও টিকাদানের নথিপত্র লুট হওয়ার অভিযোগ ঘিরে।
টিকাদানের রেজিস্টারে শিশুদের কোন টিকা দেওয়া হয়েছে, কোন ডোজ বাকি রয়েছে এবং পরবর্তী টিকা দেওয়ার সময় কখন—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
রেজিস্টার হারিয়ে গেলে শিশুদের টিকাদানের পূর্ববর্তী তথ্য খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে অনেক শিশুর পরবর্তী ডোজ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা জরুরি। সংরক্ষণব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট টিকাগুলো ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন।
আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন হারিয়ে বিপাকে গর্ভবতী নারীরাঃ
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করা হয়েছে।
স্বল্প আয়ের গর্ভবতী নারীদের জন্য এই ধরনের স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষা করানোর সামর্থ্য না থাকায় অনেকেই স্বল্পমূল্যের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করেন।
কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব নারী এখন কোথায় গর্ভকালীন পরীক্ষা করাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগঃ
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরদিন সেখানে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল।
এমন সময়ে টিকাদান কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নির্ধারিত কর্মসূচির আওতায় থাকা শিশুদের টিকা কোথায় দেওয়া হবে এবং টিকাদান কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জমি দখলের অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাঃ
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অভিযোগ উঠলেও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
জমির মালিকানা, দখলের চেষ্টা এবং হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার দাবি উঠেছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নঃ
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, হামলার সময় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কেন্দ্রটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
এত বড় একটি স্থাপনা ভাঙার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, কখন খবর পেয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কতটা সময় লেগেছিল—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।
সরকারের কাছে ৮টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ
মিরপুরের এই ঘটনা ঘিরে সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
১. পুলিশকে খবর দেওয়ার পরও কেন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি রক্ষা করা গেল না?
২. জমি দখলের অভিযোগের পেছনে কারা রয়েছে এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা কি তদন্ত করা হবে?
৩. হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত সব ব্যক্তিকে কি আইনের আওতায় আনা হবে?
৪. লুট হওয়া সরকারি টিকাগুলো উদ্ধার এবং সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
৫. হারিয়ে যাওয়া টিকাদানের রেজিস্টারের তথ্য পুনরুদ্ধার করে শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা হবে কীভাবে?
৬. কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা কোথায় দেওয়া হবে?
৭. হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি নির্ধারিত সময়ে চালু রাখতে বিকল্প কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি?
৮. ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠন এবং এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় চালুর জন্য সরকার কী পদক্ষেপ নেবে?
স্বাস্থ্যসেবা পুনরুদ্ধার ও ন্যায়বিচারের দাবিঃ
মিরপুরের এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ধ্বংসের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত ক্ষতি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর চিকিৎসাসেবা, শিশুদের টিকাদান এবং গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, লুট হওয়া সরকারি সম্পদ উদ্ধার, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সেইসব মানুষ, যাঁদের জন্য স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মিরপুরের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা আবার কবে এবং কীভাবে স্বাভাবিক হবে?

স্টাফ রিপোর্টার 










