নিউইয়র্ক ০৬:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
স্বপ্নের আমেরিকা, ৩৪ বছরের সংগ্রাম—শেষ ঠিকানা হলো দেশের মাটি ! ৫০ বছরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুর, সরকারি টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট … শুভ জন্মাষ্টমী” এবার “শ্রীকৃষ্ণের কততম জন্মবার্ষিকী?” ট্রাইব্যুনালে লোমহর্ষক সাক্ষ্যঃ বলেশ্বর নদীতে বন্দিদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হতো রংপুরে চার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নিউইয়র্কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ সিলেটের গর্বিত সন্তান Pankaz Talukder সিভিলিয়ান জীবন থেকে U.S. Army Soldier. ক্ষমতার সেকাল, একালঃ প্রভাবশালী আইজি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেফতার পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ পুনর্বহাল, বাদ টুঙ্গিপাড়ার সমাধিসৌধ হেপাটাইটিস ‘এ’-তে আক্রান্ত সনিকা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জনপ্রিয় গায়িকা রূপপুরে বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের শুরু

স্বপ্নের আমেরিকা, ৩৪ বছরের সংগ্রাম—শেষ ঠিকানা হলো দেশের মাটি !

  • স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেটের সময়ঃ ১০:৪৬:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
    • ৪ বার পড়া হয়েছে

৩৪ বছরের প্রবাস জীবন,তবুও মেলেনি গ্রিন কার্ড, অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়েই আমেরিকা থেকে কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরছেন আজিজুল হক খোকন।

পরিবারের জন্য সারা জীবন, নিজের স্বপ্নগুলো রয়ে গেল অধরা!

প্রবাসে আসার সময় চোখে থাকে হাজারো স্বপ্ন। ভালো একটি চাকরি, আর্থিক সচ্ছলতা, পরিবারের মুখে হাসি, নিজের একটি সুন্দর সংসার—সব মিলিয়ে নতুন জীবনের একরাশ প্রত্যাশা। কিন্তু সবার জীবনে সেই স্বপ্নের সমাপ্তি সুখের হয় না। কারও কারও কাছে প্রবাস হয়ে ওঠে দীর্ঘ সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর না-পাওয়ার এক নীরব ইতিহাস।

নিউইয়র্কের প্রবাসী কাজী আজিজুল হক খোকনের জীবন যেন সেই বাস্তবতারই এক বেদনাদায়ক উদাহরণ।

১৯৯৪ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন মাগুরা সদর উপজেলার বগিয়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের সন্তান খোকন। ভেবেছিলেন, কঠোর পরিশ্রম করে নিজের ভাগ্য বদলাবেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন, একদিন হয়তো নিজের জন্যও গড়ে তুলবেন একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে জীবনের অনেক হিসাব। কেটে গেছে ৩৪টি বছর। নিউইয়র্কের পথে-প্রান্তরে জীবিকার তাগিদে ছুটেছেন তিনি, কাজ করেছেন, উপার্জন করেছেন। অথচ দীর্ঘ প্রবাসজীবনেও তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন—গ্রিন কার্ড পাওয়া—পূরণ হয়নি।

পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নগুলোই যেন পেছনে পড়ে রইল।

জানা যায়, খোকন নিজের উপার্জনের বড় অংশই পাঠাতেন বাংলাদেশের বাড়িতে থাকা মা-বাবা ও ভাইবোনদের জন্য। পরিবারের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় গড়ে তোলা হয়ে ওঠেনি। ব্যক্তিগত জীবনেও গড়ে ওঠেনি নিজের একটি সংসার।

প্রবাসের জীবন বাইরে থেকে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে কত না বলা কষ্ট! আপনজনদের থেকে দূরে থাকা, অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা, নিজের ইচ্ছাগুলো বিসর্জন দেওয়া—এসবের খবর অনেক সময় কেউ রাখে না। দূরদেশে উপার্জন করা অর্থ দেশে পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়, অথচ সেই উপার্জনকারীর নিজের জীবনে কতটা অপূর্ণতা জমে থাকে, তা অজানাই থেকে যায়।

গত ৩ অক্টোবর ২০২৬, কর্মস্থলে যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন খোকন। তাঁকে নিউইয়র্কের জ্যামাইকা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর কয়েক দিন পর তাঁর স্বজন ও পরিচিতজনেরা মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন।

এরপর শুরু হয় তাঁর শেষযাত্রার প্রস্তুতি। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি ও বাংলাদেশ সোসাইটিসহ প্রবাসীদের সহযোগিতায় তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

যে মানুষটি দীর্ঘ ৩৪ বছর দূরদেশে কাটিয়েছেন পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়, জীবনের শেষ বিদায়ে তাঁর পাশে দাঁড়াতে হয়েছে কমিউনিটির মানুষদের। এই বাস্তবতা প্রবাসজীবনের আরেকটি নীরব দিক সামনে নিয়ে আসে—সবাই বিদেশে এলেই প্রতিষ্ঠিত হন না, সবার স্বপ্নও পূর্ণতা পায় না।

আজিজুল হক খোকনের গল্প শুধু একজন প্রবাসীর মৃত্যুর খবর নয়। এটি সেইসব মানুষের গল্প, যাঁরা পরিবারের ভালো থাকার জন্য নিজের সুখকে বিসর্জন দেন; যাঁরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন একটি স্থিতিশীল জীবনের আশায়; অথচ শেষ পর্যন্ত অনেক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যায়।

স্বর্গের মতো শান্তি কি শুধু বিদেশের মাটিতে, নাকি নিজের দেশের আপনজনদের কাছেও তা খুঁজে পাওয়া যায়?

বিদেশে অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকতে পারে, জীবনের মান উন্নত করার সম্ভাবনাও থাকতে পারে। কিন্তু মানসিক শান্তি, আপনজনের সান্নিধ্য আর নিজের মাটির টান—এসবের মূল্যও কম নয়। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা শুধু কত অর্থ উপার্জন করলাম, তা দিয়ে মাপা যায় না; নিজের জন্য কতটা বাঁচলাম, কতটা শান্তিতে থাকলাম, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

খোকনের শেষযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সব স্বপ্ন পূরণ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের জীবন, ভবিষ্যৎ ও মানসিক শান্তির জন্যও কিছুটা জায়গা রাখা জরুরি।

আজ যে মানুষটি এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় এসেছিলেন, তিনি ফিরছেন দেশের মাটিতে—অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা আর দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতি নিয়ে।

প্রবাসের মাটিতে ৩৪ বছরের পথচলা শেষ। রয়ে গেল এক জীবনের গল্প, কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন আর একটি কঠিন প্রশ্ন—অন্যদের ভালো রাখতে গিয়ে আমরা নিজের ভালো থাকাটুকু কতবার ভুলে যাই?

বিদায়, আজিজুল হক খোকন। আপনার দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প প্রবাসে থাকা অসংখ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলে থাকবে।

আপনার আত্মার শান্তি কামনা করি। শোকসন্তপ্ত স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা।

বিধান পাল, নিউইয়র্ক

ট্যাগ :

স্বপ্নের আমেরিকা, ৩৪ বছরের সংগ্রাম—শেষ ঠিকানা হলো দেশের মাটি !

স্বপ্নের আমেরিকা, ৩৪ বছরের সংগ্রাম—শেষ ঠিকানা হলো দেশের মাটি !

আপডেটের সময়ঃ ১০:৪৬:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

৩৪ বছরের প্রবাস জীবন,তবুও মেলেনি গ্রিন কার্ড, অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়েই আমেরিকা থেকে কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরছেন আজিজুল হক খোকন।

পরিবারের জন্য সারা জীবন, নিজের স্বপ্নগুলো রয়ে গেল অধরা!

প্রবাসে আসার সময় চোখে থাকে হাজারো স্বপ্ন। ভালো একটি চাকরি, আর্থিক সচ্ছলতা, পরিবারের মুখে হাসি, নিজের একটি সুন্দর সংসার—সব মিলিয়ে নতুন জীবনের একরাশ প্রত্যাশা। কিন্তু সবার জীবনে সেই স্বপ্নের সমাপ্তি সুখের হয় না। কারও কারও কাছে প্রবাস হয়ে ওঠে দীর্ঘ সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর না-পাওয়ার এক নীরব ইতিহাস।

নিউইয়র্কের প্রবাসী কাজী আজিজুল হক খোকনের জীবন যেন সেই বাস্তবতারই এক বেদনাদায়ক উদাহরণ।

১৯৯৪ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন মাগুরা সদর উপজেলার বগিয়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের সন্তান খোকন। ভেবেছিলেন, কঠোর পরিশ্রম করে নিজের ভাগ্য বদলাবেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন, একদিন হয়তো নিজের জন্যও গড়ে তুলবেন একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে জীবনের অনেক হিসাব। কেটে গেছে ৩৪টি বছর। নিউইয়র্কের পথে-প্রান্তরে জীবিকার তাগিদে ছুটেছেন তিনি, কাজ করেছেন, উপার্জন করেছেন। অথচ দীর্ঘ প্রবাসজীবনেও তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন—গ্রিন কার্ড পাওয়া—পূরণ হয়নি।

পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নগুলোই যেন পেছনে পড়ে রইল।

জানা যায়, খোকন নিজের উপার্জনের বড় অংশই পাঠাতেন বাংলাদেশের বাড়িতে থাকা মা-বাবা ও ভাইবোনদের জন্য। পরিবারের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় গড়ে তোলা হয়ে ওঠেনি। ব্যক্তিগত জীবনেও গড়ে ওঠেনি নিজের একটি সংসার।

প্রবাসের জীবন বাইরে থেকে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে কত না বলা কষ্ট! আপনজনদের থেকে দূরে থাকা, অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা, নিজের ইচ্ছাগুলো বিসর্জন দেওয়া—এসবের খবর অনেক সময় কেউ রাখে না। দূরদেশে উপার্জন করা অর্থ দেশে পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়, অথচ সেই উপার্জনকারীর নিজের জীবনে কতটা অপূর্ণতা জমে থাকে, তা অজানাই থেকে যায়।

গত ৩ অক্টোবর ২০২৬, কর্মস্থলে যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন খোকন। তাঁকে নিউইয়র্কের জ্যামাইকা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর কয়েক দিন পর তাঁর স্বজন ও পরিচিতজনেরা মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন।

এরপর শুরু হয় তাঁর শেষযাত্রার প্রস্তুতি। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি ও বাংলাদেশ সোসাইটিসহ প্রবাসীদের সহযোগিতায় তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

যে মানুষটি দীর্ঘ ৩৪ বছর দূরদেশে কাটিয়েছেন পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়, জীবনের শেষ বিদায়ে তাঁর পাশে দাঁড়াতে হয়েছে কমিউনিটির মানুষদের। এই বাস্তবতা প্রবাসজীবনের আরেকটি নীরব দিক সামনে নিয়ে আসে—সবাই বিদেশে এলেই প্রতিষ্ঠিত হন না, সবার স্বপ্নও পূর্ণতা পায় না।

আজিজুল হক খোকনের গল্প শুধু একজন প্রবাসীর মৃত্যুর খবর নয়। এটি সেইসব মানুষের গল্প, যাঁরা পরিবারের ভালো থাকার জন্য নিজের সুখকে বিসর্জন দেন; যাঁরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন একটি স্থিতিশীল জীবনের আশায়; অথচ শেষ পর্যন্ত অনেক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যায়।

স্বর্গের মতো শান্তি কি শুধু বিদেশের মাটিতে, নাকি নিজের দেশের আপনজনদের কাছেও তা খুঁজে পাওয়া যায়?

বিদেশে অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকতে পারে, জীবনের মান উন্নত করার সম্ভাবনাও থাকতে পারে। কিন্তু মানসিক শান্তি, আপনজনের সান্নিধ্য আর নিজের মাটির টান—এসবের মূল্যও কম নয়। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা শুধু কত অর্থ উপার্জন করলাম, তা দিয়ে মাপা যায় না; নিজের জন্য কতটা বাঁচলাম, কতটা শান্তিতে থাকলাম, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

খোকনের শেষযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সব স্বপ্ন পূরণ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের জীবন, ভবিষ্যৎ ও মানসিক শান্তির জন্যও কিছুটা জায়গা রাখা জরুরি।

আজ যে মানুষটি এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় এসেছিলেন, তিনি ফিরছেন দেশের মাটিতে—অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা আর দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতি নিয়ে।

প্রবাসের মাটিতে ৩৪ বছরের পথচলা শেষ। রয়ে গেল এক জীবনের গল্প, কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন আর একটি কঠিন প্রশ্ন—অন্যদের ভালো রাখতে গিয়ে আমরা নিজের ভালো থাকাটুকু কতবার ভুলে যাই?

বিদায়, আজিজুল হক খোকন। আপনার দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প প্রবাসে থাকা অসংখ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলে থাকবে।

আপনার আত্মার শান্তি কামনা করি। শোকসন্তপ্ত স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা।

বিধান পাল, নিউইয়র্ক