ad-banner
শুক্রবার, এপ্রিল ৪, ২০২৫
usbd24
spot_img

বাংলা ভাষা : আবেগ ও বাস্তবতা

ভাষা আন্দোলনের প্রায় ৭০ বছর পেরিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে ভাষা প্রজন্ম, হাতেগোনা দু-চারজন ছাড়া। যারা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন ভাষা আন্দোলনের সঠিক ঘটনাপঞ্জি। বলতে পারবেন আন্দোলনের বাস্তব পটভ‚মি। বিবৃত করতে পারবেন একুশের সঠিক চেতনার কথা। এদের পর এ ব্যাপারে আনুপূর্বিক বর্ণনা দেয়ার কেউ থাকবে না। এই শূন্যতার জায়গায় আসার সমূহ সম্ভাবনা ইতিহাস বিকৃতির।

একুশে ছিল বাংলা ভাষার পরিপূর্ণ মর্যাদার প্রশ্ন, রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার, স্বীকৃতি পাওয়ার লড়াই। এ লড়াই অন্য কোনো ভাষা বা ভাষাভাষীর বিরুদ্ধে ছিল না। বাংলা ভাষা স্বকীয় পরিপূর্ণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হোক, রাষ্ট্রীয় জীবনাচারে এটিই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। তৎকালীন পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জনের একটি বাস্তবতা।

ইতোমধ্যে বদলেছে আমাদের জীবনাচার, বদলেছে চিন্তা-চেতনা। আন্তর্জাতিক পরিচয়ে অভিষিক্ত হওয়ার আকাক্সক্ষায় আমাদের জীবনের লক্ষ্য পাল্টেছে। সাথে সাথে কমেছে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ, চর্চা ও শেখার উৎসাহ। বেড়েছে ইংরেজির প্রতি আগ্রহ। এখন সারা দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা মাধ্যম স্কুলের চেয়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রাধান্য। এমনকি গ্রাম-গঞ্জেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছড়াছড়ি। ইন্টারনেট, মোবাইল এসবের প্রভাবে ইংরেজির মোকাবেলায় বাংলা কোণঠাসা। এক ধরনের উদ্ভুতুড়ে বাংলিশ, বাংরেজি বা বান্দি ভাষার অত্যাচারে বাংলা এখন ক্ষত-বিক্ষত। সরকারি-বেসরকারি চাকরি, বিদেশ গমন, ব্যবসায়-বাণিজ্য সর্বত্রই ইংরেজির দাপট। ফলে দাফতরিক ভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমাদের জীবনে বাংলা ভাষা এখন অপসৃয়মান। সাথে সাথে ম্র্রিয়মান একুশের চেতনাবোধ।

অবস্থাটা এক দিনে হয়নি। ভাষা আন্দোলনের পটভ‚মিতে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমির দায় এখানে সবচেয়ে বেশি। সোজাসাপটা বলতে গেলে, ভাষা আন্দোলনের সঠিক নির্মোহ ইতিহাস, একুশের মৌলিক চেতনা, ভাষাসৈনিকদের সঠিক তালিকা প্রণয়নে দুর্বোধ্য কারণে ব্যর্থতা, অনেকাংশেই এর জন্য দায়ী। সঠিক ইতিহাসের অনুপস্থিতির সুযোগে ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে এবং হচ্ছে অবলীলায়। বাংলা ভাষাকে বাণিজ্যিক ভাষা হিসেবে রূপান্তরের ক্ষেত্রে একাডেমির দৈন্যতার অসহায়ত্ব করুণার উদ্রেক করে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। অথচ বাংলাকে বাণিজ্যিক ভাষায় রূপান্তর ও তথ্যপ্রযুক্তিতে এর ব্যবহার না বাড়ালে বাংলা সীমিত ব্যবহারিক ভাষা হিসেবেই হয়তো টিকে থাকবে। এ ছাড়াও বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, সাহিত্যিকদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করার উদ্যোগ, বিভিন্ন দেশে বাংলা শেখার অনুষ্ঠান বা ক্লাসের আয়োজনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অথচ বছরের পর বছর ধরে বিবিসি ইংরেজি শেখার ক্লাস চালিয়েছে। পরিণতিতে এখন বিভিন্ন নামকরা ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের শাখা খুলেছে আমাদের দেশে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কয়েক বছর। তার কার্যক্রম সম্পর্কে খুব কম লোকই জানেন। স্বকীয় পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে বিভিন্ন ভাষার শব্দচয়ন ভাষার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অথচ বাংলা অভিধান রচনার ক্ষেত্রে অন্য ভাষার আত্তীকৃত শব্দগুলোকে বোঁটিয়ে বিদায় করার চেষ্টা বাংলা ভাষাকে কতটুকু সমৃদ্ধ করবে তা ভাববার বিষয় বটে। সামাজিক কৌলীন্যের ভাষা এখন ইংরেজি। ইদানীং মাঝে মধ্যে বাংলা ইংরেজির সাথে সাথে হিন্দিতেও দোকানের সাইনবোর্ড লিখতে দেখা যায়, যা বাংলা ভাষার ভবিষ্যত সম্পর্কে নিঃসন্দেহে আতঙ্কিত করে তোলে। অথচ ফেব্রæয়ারি এলে আমরা গা ঝাড়া দিয়ে উঠি; সাময়িক বাংলা প্রীতিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠি।

২০১০ সালে দেশের ভেতর মাতৃভাষার উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। একই লক্ষ্যে বিস্তৃত কর্মসূচি নিয়ে ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি। দু’টি প্রতিষ্ঠানেরই কাজ অভিন্ন। এ ক্ষেত্রে তাদের ওপর কাজের গতি-প্রকৃতি বেগবান হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষাচর্চা, লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বাংলার দুরবস্থার সাথে সাথে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পাঠ্যক্রমে ইংরেজি ভার্সন চালু করেছে। উচ্চশিক্ষার বেলায় অবস্থাটা কী তা সহজেই অনুমেয়। ইংরেজি না জানলে চাকরি নেই। যোগ্যতার মাপকাঠিতে বাংলা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। সমাজের যারা বিত্তবান তারা তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করাচ্ছেন। আর যারা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ব্যয়ভার জোগানের ক্ষমতা না থাকায় বাধ্য হয়ে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছেন।

শিক্ষাজীবনের শুরুতেই দ্বিধাবিভক্ত দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। একাংশ বিত্ত ও আভিজাত্যের আবহে ইংরেজি শিক্ষিত হয়ে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসছে; আরেক দল বাংলা শিক্ষিত প্রজন্ম অনুগ্রহপ্রার্থীর তালিকায় নাম লেখাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ভাষা অপমানিত হয়, লাঞ্ছিত হয়; তেমনি অন্য দিকে তা উপেক্ষিতও হয়। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে অচিরেই বাংলা ভাষা শুধু মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের ভাষা হয়ে থাকবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভাষার উত্তরণ অত্যন্ত জরুরি; বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ব্যবসার ক্ষেত্রে। যে জাতি যত দ্রুত ভাষা অর্থনৈতিক ও তথ্যপ্রযুক্তির কাজে লাগিয়েছে তারাই এগিয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাপান, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কথা বলা যায়। আরেকটি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে প্রায়োগিক করা দরকার। তা হচ্ছে, জাতিসঙ্ঘের দাফতরিক ভাষায় রূপান্তরিত করা। এটি বেশ ব্যয়বহুল নিঃসন্দেহে। কিন্তু যখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের অর্থায়ন ঠেকে যাচ্ছে না, সে ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন কর্মযোগে আর্থিক সঙ্গতির দোহাই নিতান্তই বেমানান।

বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ভাবাবেগের আশ্রয় না নিয়ে সদিচ্ছা ও বাস্তবধর্মী কর্মযোগের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষায় উন্নীত করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো দরকার।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
Email- shah.b.islam@gmail.com

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

Latest Articles