মঙ্গলবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৯শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি.
SKF Company

স্মৃতির প্রবাহে রামমালা ছাত্রাবাস (মহেশাঙ্গন)- কুমিল্লা ।

১৫-জুন-২০২১ | Dhaka Desk | 186 views

স্মৃতির প্রবাহে রামমালা ছাত্রাবাস (মহেশাঙ্গন)- কুমিল্লা ।

——————————————————————————  

        Priyalal Nath( New York), আজ 2021 সালের 16 ই জুন। আজকের এই দিনটিতে রামমালা ছাত্রাবাসের সাথে আমার অনেক বড় একটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আর এই স্মৃতির ভার থেকে কিছুটা মুক্তি পেতেই অতীতের রামমালায় ফিরে গিয়ে সেই চেনা সময়ের ডায়রী থেকে কয়েকটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে এনে ফেসবুকে রাখলাম।

        1996 সালের এই দিনেই এক দৈব আশীর্বাদে রামমালা ছাত্রাবাস থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসার মাধ্যমে রামমালাতে থাকার পরিসমাপ্তি ঘটে। ফেলে আসি তাপস দাদা, গোবিন্দ, তপন, সুকেন্দু, গৌতম, লিটন, নেপাল, শিবেন, পীযূষ, জীবন, বিনয় ও সুবাস সহ অন্যান্য ইয়ারমেট ও ছোট ভাইদের কে (ক্ষমা করবে সবার নাম লিখতে পারিনি)। তাই প্রতি বছরের এই দিনটি এক মহামায়াময় গল্পের গাঁথুনি নিয়ে স্মৃতির দরজার কড়া নাড়ে। ঐদিন সবাইকে ছেড়ে চলে আসার আবেগী মুহূর্তটা এখনো যে বৈচিত্র্যময় বহুমাত্রিক রূপে হৃদয়ে ফ্রেম বন্দি হয়ে আছে যার দিকে তাকালেই আনন্দাশ্রুতে চোখের কোণ গুলো চিক চিক করতে থাকে। এর পরবর্তী কয়েকটি দিন উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম ‘ছেড়ে যাওয়া ‘ সত্যিই শূন্যতার জন্ম দেয়। আজ পঁচিশ বছর পর মনে আছে সেই দিনটির কথা? আমি চলে আসার সময় তোমরা সবাই আমার সাথে সাথে ঈশ্বর পাঠশালার গেইট পর্যন্ত এসেছিলে। দিয়েছিলে বড় একটি ফুলের তোড়া ও অন্যান্য উপহার সামগ্রীসহ অনেক গুলো গানের ক্যাসেট এর সাথে দুইটি মুজিব পরদেশীর গানের ক্যাসেট। ইয়ারমেটরা, মুজিব পরদেশীর গানের ক্যাসেট এর কথা শুনে হাসাহাসি করবে না, প্লিজ। আমি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় গুন গুনিয়ে মুজিব পরদেশীর গান গাইতাম বলেই তোমরা আমাকে মুজিব পরদেশীর গানের ক্যাসেট উপহার দিয়েছিলে। সুদূর প্রবাসে দুষ্টামি স্বরূপ সেই শীতের শিশিরের মত ফোঁটা ফোঁটা আবেগ বিন্দুগুলোই আমার স্মৃতিতে ও স্মরণে উজ্জ্বল হয়ে ঘুরে বেড়াই সমান সতেজতা ও সজীবতা নিয়ে।

        রামমালার সেই সময়টা ছিল জীবনের অপরাজেয় সময় যেখানে প্রতিটি মাসই ছিল পলাশের মাস। ফাগুনের আভায় যে সময়টা এখনো স্মৃতিতে রং ছড়াই, জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আজ সেই সময়টাকেই খুঁজে বেড়াই। আজকের এই সোনালী দিনের কঠোরতায় সেই রুপালি দিনের নির্মলতার নিঃশ্বাস নিয়েই যেন কিছুটা ক্লান্তির মুক্তি মিলে। আর তাইতো চির চঞ্চল, রঙ্গিন ও ডিজিটালাইজেশনের পর্দা দিয়ে মোড়ানো এই শহরের হাজার ব্যস্ততার মাঝেও রামমালার সেই দিনগুলোই আজকের এই দিনে সোনালী সময়ের সোনালী রং হয়ে স্মৃতির পটে ভেসে উঠে।

        রামমালা থেকে বিদায় নিয়ে আসার ঠিক দুই দিন পরেই এক অব্যক্ত প্রশান্তির প্রত্যাশায় রঙ্গিন স্বপ্নের উপর ভর করে পাড়ি পরেছিল আটলান্টিকের এপারে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ আর ভালোবাসা ও মায়া- মমতা দিয়ে ভরা এক মহামানব (বাংলাদেশ) এর কোল থেকে জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ভরপুর আর এক মহামানব এর কোলে। আমাদের এই মহামানব মানবিক হতে যথেষ্ট শিক্ষা দিলেও মায়া-মমতা দিয়ে একেবারেই কাউকে জড়িয়ে ধরে না কেননা পুঁজিপতিরা সবসময়ই নির্মম হয়ে থাকে।

        এরই মধ্যে আজ অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। মানুষের জীবনধারা তথা সমাজও বদলে গেছে অনেক। আর প্রযুক্তির অগ্রগতির কথাতো ভাবাই যায় না। প্রযুক্তির অগ্রগতির দিকে তাকালে মনে হয় পৃথিবী নামের গ্রহটা যেন এই বর্তমান সময়টাকেই দেখার জন্য অপেক্ষা করতেছিল। আজ হঠাৎ করে ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে ফিরে দেখি বয়সটা কখন যে নিঃশব্দে পা ফেলে চব্বিশ থেকে উনপন্চাশে পৌঁছে গেছে! একটু বুঝতেও পারিনি। এখানে এসে বিগত পঁচিশটি বছর ধরেই দুইজন সাথীকে খুবই কাছাকাছি পেয়েছি। এদেরকে এতটাই কাছে পেয়েছি যে তারা যেন আমাকে একা ছাড়তেই চাই না। তাই তাদেরকে সব সময় সাথে নিয়েই থাকি। যাদের একজন হলেন কল্পনা অপর জন হলেন স্মৃতি।

        ছুটির দিনের ভোর বেলায় রবীন্দ্র সংগীত ও নজরুল সঙ্গীত শুনতে শুনতে আবার কোনো কোনো সময় পড়ন্ত বিকেল বেলায় বাসার সামনের পার্কটাতে বসে সেই নব্বইয়ের দশকের রুবি রায়, নীলাঞ্জনা, বেলা বোস, অনন্যা ও রাজশ্রীদের কে নিয়ে ভালোবাসা বহিঃ প্রকাশের গান গুলোর যে রেখা হৃদয়ের উপর আঁকা সেগুলো মনে হলে কল্পনা আর স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে গিয়ে দেখি যে রামমালার ঐ দিনগুলো আজও যেন সেই প্রথম দিনের মতোই বুকের মধ্যে বেদনার সুর  হয়ে মুখ লুকিয়ে চুপ করে বসে আছে। আজও যে হৃদয়ে অনুভবের স্পন্দন অনুভূত হয় রাম মালার সেই সুন্দর জীবনবোধ সম্পন্ন ভাষাহীন ভালোলাগার আনমনা দিনগুলোর জন্য। যে দিনগুলো জীবন প্রবাহে বারবারই হাতছানি দিয়ে যায়। পাশ্চাত্যের আধুনিকতায় গা ভাসাইনি আমি। আর সেজন্যই যেখানে ছিল শুধুই সাদা আলো, সেখানে ছিল সবই ভালো, সেই রামমালার আলোঝরা সাদা কালো’র দিনগুলোর স্মৃতির মুগ্ধতা এখনো আমার মনের মরীচিকায় সমানভাবে অব্যাহত।

        বিশেষ করে প্রতি বছর সরস্বতী পূজা আসলেই রামমালার সরস্বতী পূজার কথা খুব মনে পড়ে। রামমালার সরস্বতী পূজা-এ যেন ছিল এক অন্য রকম মুগ্ধতার ছোঁয়া! রামমালার পরিবেশটাই যেন ফাল্গুনী হাওয়ায় সেই সময়ে পূজার একটা আবহ তৈরি করে দিত যে আবহতে দিনে গোলাপ আর রাতে রজনী গন্ধার গন্ধ বয়ে বেড়াত। পূজার আগের দিনে শুভ্রদেবীর আগমনের আশাতে স্বর রূপ নিত সুরেতে। পূজার দিনে দেবীর আগমনে শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়ত প্রাণে। আর পরের দিনে বিনাদেবীর বিদায়ের ব্যথাতে মুখের কথাগুলো রূপ নিত গীতিকবিতাতে। পূজার তিনটি রাতই যেন দ্বীপ ও ধুপের ঘ্রানে সুর ও গান নিয়ে আসত প্রানে। সারারাত জেগে থাকার অভ্যাসটা আমার তখন থেকেই শুরু হয়। তখন অল্প মূল্যের জামা কাপড় ব্যবহার করে যে আনন্দ পেতাম এখন অধিক মূল্যের ডিজাইন করা ছেঁড়া জিন্স আর ব্র্যান্ডের শার্ট গায়ে দিয়েও সেই আনন্দ আর পাই না। এখনো প্রতি বছর সরস্বতী পূজা আসলেই কল্পনা যেন আমাকে ডেকে বলে আবারও দেখা হবে কোন একদিন কল্পলোকের সিঁড়ি বেয়ে পূজার শেষে!

আমার মনে হয় আমার মত এরকম ভাবনা রামমালার সকল ছাত্রদের মধ্যেই বিদ্যমান।

        আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম রামমালাতে সমর্পিত প্রাণ। তাই  টিনের ঘর আর পুরনো  দালান ঘরের মধ্যে যে কতটা সমৃদ্ধতা আর হৃদ্যতার ঠাঁই হতে পারে তা আজ বুঝতে পারি! রামমালা আমাদের সময়ের প্রত্যেকেই ভাবতে শিখেছিল, চিন্তাশক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছিল আর করে তুলেছিল মানবিক। রামমালাই সর্ব প্রথম শিক্ষা দিয়েছিল হাত পেতে কারো কাছ থেকে কোন কিছু নিতে নেই। যে শিক্ষাটা সার্বিক জীবন ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাস্তবিক। ছোটবেলায় শুনেছিলাম জায়গা নাকি জীবনে বড় একটা ভূমিকা রাখে। রামমালা ঠিক তেমনি একটি প্রতিষ্টান যা নির্ধারণ করে দেয় জীবনের গতি কি হবে।

        ঈশ্বর পাঠশালার মাঠ, তোমাকে বলি! জানিনা তোমার আজ মনে আছে কিনা!  আমি কিন্তু আজও ভুলিনি পূর্ণিমার রাতে চাঁদের হাজারো জোসনা কনাতে লুকিয়ে থাকা তারার আলোয় শরতের মায়াবী আবেশে আর বসন্তের মহুয়া বাতাসে কত রাতের যে অধিকটা সময় কাটিয়েছি শান্ত, নিভৃত পরিবেশে তোমাতে বসে! তা যে আজ শুধুই স্মৃতির সমুদ্রে ভাসে। এমন মধুময় সময় জীবনে আসে কি বারে বারে?

        মনে পড়ে রামমালার গেইটের সামনেই ছিল একটা পলাশের গাছ। তার আর একটু সামনে ছিল একটি কৃষ্ণচূড়া ফুলের গাছ। ঘুম না আসা রাতের প্রথমভাগে আবার কখনো ঘুম ভাঙ্গা রাতের মধ্যভাগে স্মৃতিতে জড়িয়ে থেকে গাছ দুইটিকে জিজ্ঞাসা করি

                                       আর কি কখনো দেখা হবে?

           উত্তরে যেন বলে, যদি আবার কোনদিন আস তবে!

                                       ভালো থেকো রামমালা।

                                        6/1992   থেকে 6/16/1996.

                                        Priyalal Nath( New York)

                                        June 16, 2021

Spread the love

সার্চ/অনুসন্ধান করুন

USA JOBS LINKS