বুধবার, ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৯ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি.
SKF Company

নৃত্যগুরু ও প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী অনুপ দাস আর আমাদের মাঝে নেই

২১-জুলা-২০২০ | Dhaka Desk | 234 views
anup das

বিধান পাল,নিউইয়র্কঃ আমাদের মধ্যে শিল্পী অনেক কিন্তু ক’জন সাধক হতে পারেন! কিংবা শিল্পীদের পরিবেশন হয় হাজার হাজার কিন্তু নিবেদন হয় হাতেগোনা কয়েকটিই। শিল্পের জন্য শিল্প না জীবনের জন্য শিল্প, না পুরো জীবনটাই একটি শিল্প তা দেখতে আমাদের খুব বেশিদুর যেতে হয় নি। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা নিউইর্য়ক যেখানেই তাকে দেখেছি ধ্যানী,নিমগ্ন একজন সাধক নৃত্যশিল্পী হিসেবে দেখেছি আমরা।জনপ্রিয় কত্থকের নিপুণ কারিগর, রবিঠাকুরের প্রতিটি নৃত্যনাট্যের সফল কোরিওগ্রাফার, নৃত্যশিল্পের জন্য জীবন বাজিকর, সদাবিনয়ী, নৃত্যগুরু,মানবিক মানুষ- অনূপ দাশ। অসময়ে চলে যাওয়া – এই ক্ষতি অপূরনীয়।

তিনি দীর্ঘ দিন থেকে কিডনি জনিত রোগে ভুগছিলেন, অনুপ দাসের দুটো কিডনি নষ্ট ছিল। সেটা নিয়েই তিনি নাচ শেখাতেন।  সবার সঙ্গে হাসিমুখে মিশতেন। অনেকেই জানতো না হাসির শেষে তাঁর বেদনার কথা। ৫৬ বছর বয়সে নিজের ঘরে একাকী অবস্থায় মৃত্যু হল অনুপ কুমার দাসের। প্রতিদিন রাতে নিজেই নিজের ডায়ালাইসিস করতেন। রবিবার রাতে ডায়লেসিস করার অবস্থাতে চিরবিদায় নিলেন।

নিউইয়র্ক নগরের ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার শায়ারের শেষ মাথায় এক ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। অসুস্থ বাবা-মা দীর্ঘদিন ধরে নার্সিংহোমে। তাদের নিয়মিত দেখতে যেতেন অনুপ কুমার। ছিলেন চিরকুমার। ২০ জুলাই সকালে অনুপ কুমারকে তাঁর ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় দেখেন বন্ধু ব্রুস। মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, এটা জানা গেছে।

২১ জুলাই অনুপ দাসের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল হাসপাতালে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। নিজেই বাসায় ডায়ালাইসিস করতেন। ব্রুস নামে তাঁর বন্ধু ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলে এসে নিয়ে যেতেন। ব্রুসের কাছে বাসার চাবি ছিল। তিনি ২০ জুলাই বন্ধুকে দেখতে দুপুর দুইটার দিকে গিয়ে ঘরে তাঁকে মৃত পড়ে থাকতে দেখেন।

অনুপ দাসের হঠাৎ মৃত্যুতে নিউইয়র্কে বাঙালি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া। তিনি নাচের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তিনি যেভাবে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে শেখাতেন, সেটা ছিল অত্যন্ত বিরল। বাফার হয়ে চণ্ডালিকা-মায়ার খেলাসহ বহু নৃত্যনাট্যের নির্দেশনা দিয়েছেন।

অনুপ দাস ১৮ জুলাই জুমে ছাত্রীদের ক্লাস নিয়েছেন। আগের দিন ১৭ জুলাই ফোনে বাবা–মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। ১৯ জুলাই কারও সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দুটি কিডনিই নষ্ট। সেই নিয়েই সব জায়গায় হাসি মুখে যেতেন। প্রতিদিন রাতে নিজের ডায়ালাইসিস নিজেই করতেন। ১৯ জুলাই গভীর রাতে ডায়ালাইসিস করার সময় সম্ভবত তাঁর মৃত্যু হয়।

কারণ ২০ জুলাই দুপুরে যখন ম্যানহাটনের হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় তখন ডাক্তার জানান, প্রায় ১০ ঘণ্টা আগে মৃত্যু হয়েছে অনুপ দাসের।

নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। বাংলায় অনার্স শেষ করার পরে স্কলারশিপটি পান। তারপর মাস্টার্স শেষ না করেই চলে যান ভারতে। প্রথম এক বছর ছিলেন শান্তিনিকেতনে। ওখানে কথাকলি ও মণিপুরী শিখলেও অনুপ কুমারের মন ভরছিল না। কারণ তাঁর শেখার আগ্রহ ভরতনাট্যম ও কত্থক নৃত্য। যে দুটি শাখা বিশ্বভারতীতে ছিল না। তাই চলে যান দিল্লি। সেখানে শ্রীরাম ভারতীয় কলা কেন্দ্রে লীলা স্যামসনের কাছে ভরত নাট্যম ও মুন্নালাল শুক্লার কাছে কত্থক শিখেন অনুপ কুমার দাস। কত্থক নাচের জন্য আরেক গুরু রেবা বিদ্যার্থীর কাছেও কৃতজ্ঞ ছিলেন তিনি।

নৃত্যশিল্পী হিসেবে অনুপ কুমারের শ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল বিরজু মহারাজ নির্দেশিত নৃত্যনাট্য ‘রঘুনাথ’ অংশ নেওয়া আর নির্দেশক হিসেবে ২০১৮ সালে কুইন্স থিয়েটারে ‘মায়ার খেলা’। নিউইয়র্কর মারজিয়া স্মৃতি আর অন্তরা সাহাই শুধু নয়, অনুপ কুমার দাস উপহার দিয়েছেন আরও অনেক নামকরা নৃত্যশিল্পী। বাংলাদেশের রিচি, চাঁদনী, রিয়া সবাই তাঁর হাতে গড়া। রিয়ার প্রথম কমার্শিয়ালের কোরিওগ্রাফি করেছেন তিনি। বাফার নৃত্যশিক্ষক থাকাকালে তাঁর কাছে কত্থক নাচ শিখেছেন মৌ, রতন, স্বপন, বেবী, তান্নার মতো দেশসেরা নৃত্যশিল্পীরা। শিবলী মোহাম্মদ, সোহেল রহমান, আনিসুল ইসলাম (হিরু), কবিরুল ইসলাম (রতন)—সবাই অনুপ কুমার দাসের সমসাময়িক নৃত্যশিল্পী ও বন্ধু। তাদের ছেড়ে নিউইয়র্কে চলে এলেও নাচ ছাড়েননি তিনি।অথচ অনুপের পরিবারের কেউ নাচের মানুষ ছিলেন না। বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশের নায়িকা পূর্ণিমা সেন গুপ্তা তাঁর দূর সম্পর্কের পিসি। তিন ভাই ও এক বোনের সংসারে আর কেউ নাচ শেখেনি।

চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে অমূল্য দাস আর সুপ্রিয়া দাসের কোল আলো করে জন্ম নেওয়া শিশুটি নিউইয়র্ক শহরে ব্রডওয়ে শো থেকে শুরু করে বহু জায়গায় কাজ করেছেন। পিএস টু হান্ড্রেড স্কুলের শিক্ষক অ্যানি কাপুয়া ফেসবুকে ২০ জুলাই জানালেন, ‘আমি ওনার সঙ্গে স্কুলে কাজ করেছি। ওনার মতো চমৎকার মানুষ খুব কম দেখেছি। ছাত্র–ছাত্রীদের এত দরদ দিয়ে নাচ শেখাতেন যে, বলার নয়। ভারতীয় নাচ ও কোরিওগ্রাফি নিয়ে বহুবার কথা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। উনি নিউইয়র্ক বাঙালি কমিউনিটি নিয়ে খুব গর্বিত ছিলেন। খুব গর্ব ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি সবার কথা বলতেন। ওনার আত্মার শান্তি কামনা করছি। আমাদের স্কুলের প্রত্যেকে তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত। তার খুব সুন্দর একটা মন ছিল।

পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বহু মানুষ শোক জানিয়েছে অনুপ কুমার দাসের  মৃত্যুতে।

বিপা নিউইয়র্ক, উদীচী যুক্তরাষ্ট্র, আনন্দধ্বনি নিউইয়র্ক, ড্রামা সার্কেল নিউইয়র্ক সহ নানা সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।

https://www.youtube.com/watch?v=bebMqofBc7w

Spread the love

সার্চ/অনুসন্ধান করুন

USA JOBS LINKS